বাঁচতে হলে জানতে হবে
দৈনন্দিন কাজে মানব মেরুদন্ডে কোন কোন পজিশনে কতটুকু প্রেশার বা চাপ পড়ে

মানুষ আল্লাহপাকের সৃস্টি সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব। একমাএ মানব জাতীই মাথা উচু করে চলাফেরা করতে পারে। অন্য কোন জীব মাথা উচু করে চলাফেরা করতে পারে না। কেননা মাথা উচু করে চলাচলের জন্য মানব মেরুদন্ডটিকে লম্বালম্বি ভাবে সেট করা হয়েছে। যা প্রানিদের ক্ষেএ শোয়ানো অবস্থায় থাকে। মানব মেরুদন্ড দাড় করানো অবস্থায় থাকার জন্যই মানুষের মাথা মেরুদন্ডের উপর বসানো থাকে। যা প্রানীদের বেলায় নেই। এর ফলে মানব খুলির ভেতরের মস্তিস্ক হতে মেরুরজ্জু মেরুদন্ডের ভেতর দিয়ে নিচে নেমে গেছে পাছা অবদি। এই মেরুদন্ড হাড়, মাংশপেশী,লিগামেন্ট, টেনডন, বারসা, ক্যাপসুল, কার্টিলেজ সহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু বিভিন্ন কারনে এই কাঠামোর ব্যঘাতের কারনে এ স্ট্রাকচার নিজেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকার রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
শরীরের ভঙ্গি বা পোশ্চার এবং মুভমেন্ট অনুযায়ী মেরুদণ্ডে চাপের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। শোয়া অবস্থায় মানব মেরুদন্ডে সবচেয়ে কম ( প্রায় ২৫ কেজি প্রেসার বা চাপ পরে ), সোজা দাঁড়িয়ে থাকলে ১৫০ কেজির মতো প্রেসার বা চাপ পরে, এবং ঝুঁকে বসে ভারী কিছু তুললে মানব মেরুদণ্ডে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৪০০–৬০০ কেজি পর্যন্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা কুঁজো হয়ে বসলে ডিস্কের ওপর চাপ দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং লিগামেন্ট লুজ হয়ে ডিস্ক প্রলাপ্স হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মানব মেরুদণ্ড মানবদেহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। পুরো শরীরের নিয়ন্ত্রণ এই মেরুদণ্ডের সুস্থতার উপরে নির্ভর করে। মেরুদণ্ড আমাদের পুরো শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। মেরুদণ্ডের কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের পুরো শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যথাগ্রস্থ হয় এবং স্বাভাবিক নড়াচড়া এবং চলাফেরা কষ্টদায়ক হয়। মেরুদণ্ড সমস্যাগ্রস্ত হলে যে বিষয়টি প্রথমেই পরিলক্ষিত হয় সেটি হচ্ছে ব্যাকপেইন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অনির্দিষ্ট ব্যাকপেইন শিল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ লোকের হয়ে থাকে। এই ব্যাকপেইনের অন্যতম প্রধান কারণ মেরুদণ্ডের সমস্যা। আবার এই মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়েই আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকে। মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই স্নায়ুর উপরেও চাপ পড়ে যার কারণে আমাদের দেহে ব্যথাসহ অন্যান্য অনেক সমস্যা হতে পারে। তাই মেরুদণ্ডের যত্ন নেয়া এবং যে সকল কাজ করলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা আমাদের জন্য অত্যন্ত দরকারি। পাশাপাশি যে সকল এক্সারসাইজ আমাদের মেরুদন্ডের জন্য উপকারী সেগুলো প্রতিনিয়ত করা আমাদের জন্য জরুরী।
যেসব কারণে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে-
# আঘাত জনিত কারণে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
# মেরুদণ্ডে কোনো টিউমার হলে বা অন্য জায়গার কোনো টিউমার মেরুদণ্ডে আসলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
# ডিজেনারেটিভ ডিস্ক ডিজিজ হলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
# জন্মগত অথবা অন্য কোনো কারণে মেরুদণ্ড অস্বাভাবিক বাঁকা হয়ে গেলে।
# মেরুদণ্ডের কশেরুকা হাড় একটির ওপর আরেকটি উঠে গেলে মেরুদণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
# রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা অন্য কোন কারণে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যেতে পারে যেটাকে বলা হয় স্পনডাইলোসিস।
# অস্টিও আর্থ্রাইটিস বা অন্য কোন কারণে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যেতে পারে যেটাকে বলা হয় ডিজেনারেটিভ পেরিবর্তন ।
# যারা দীর্ঘদিন যাবৎ অতিরিক্ত ভার বহনের কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
# যারা দীর্ঘদিন যাবত ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা পরবর্তীতে তার স্বাভাবিক জায়গা থেকে বের হয়ে এসে আমাদের শরীর নিয়ন্ত্রণকারি স্নায়ু কে চাপ দিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
# যারা অস্টিওপোরোসিস সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে মেরুদন্ড যেকোনো সময় সূক্ষ্ম ভাঙ্গার সম্ভাবনা থাকে।
দৈনন্দিন জীবনযাপনের তাগিদে এবং জীবিকার সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়ত মুভমেন্ট করে যাচ্ছে। ফলে তাকে বিভিন্ন পজিশন মেইনটেন করতে হয়। এগুলো সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। ফলে এগুলো আমাদের মেরুদন্ডে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাত্রার চাপ বা প্রেশার তৈরি করে। ফলে আমরা ব্যাক পেইনে আক্রান্ত হই। আসুন, এ সম্পর্কে জেনে নিই-
- যখন আমরা চিত হয়ে শুয়ে থাকি, তখন আমাদের মেরুদন্ডে সবচেয়ে কম প্রেশার পড়ে। এর পরিমাণ ২৫ কেজি।
- যখন আমরা কাত হয়ে শুই, তখন আমাদের মেরুদন্ডে প্রেশারের পরিমাণ ৭৫ কেজি।
- যখন আমরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন আমাদের মেরুদন্ডে চাপ পড়ে ১০০ কেজি।
- যখন আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াই এবং সামনের দিকে ঝুঁকি, তখন আমাদের মেরুদন্ডে প্রেশারের পরিমাণ ১৫০ কেজি।
- যখন কোনো বস্তু সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ানো অবস্থায় তোলা হয়, তখন মেরুদন্ডে প্রেশারের পরিমাণ ২২০ কেজি।
- যখন আমরা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে থাকি, তখন আমাদের মেরুদন্ডে প্রেশারের পরিমাণ ১৪০ কেজি।
- যখন আমরা চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় সামনের দিকে ঝুঁকি, তখন আমাদের মেরুদন্ডে ১৮৫ কেজি প্রেশার পড়ে।
- আমাদের মেরুদন্ডে সবচেয়ে বেশি প্রেশার পড়ে, যখন আমরা চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় ২০ ডিগ্রি সামনে ঝুঁকে ২০ কেজি ওজনের কোনো বস্তু হাত দিয়ে টেনে তুলি, তখন মেরুদন্ডে প্রেশারের পরিমাণ ২৭৫ কেজি।
আসুন আমরা দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাক পেইনমুক্ত জীবনযাপনের জন্য দাঁড়ানো, বসা, শোয়া এবং কোনো বস্তু বহন করার ক্ষেত্রে সাবধান হই এবং সতর্কতা অবলম্বন করি। সঠিকভাবে ওজন তুলি এবং তা বহন করি। তবেই পরিপূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব। ব্যাক পেইন মুক্ত জীবনের জন্য বিস্তারিত করণীয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
সঠিক দেহভঙ্গি (Posture) মেনে চলুন
- বসার নিয়ম: পিঠ সোজা রেখে বসুন এবং মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক ঠিক রাখুন। অফিসে কাজের সময় চেয়ারের পেছনে পিঠের নিচের অংশে 'লাম্বার সাপোর্ট' বা কুশন ব্যবহার করতে পারেন।
- দাঁড়ানোর নিয়ম: একনাগাড়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। দাঁড়াতে হলে কিছুক্ষণ পর পর শরীরের ভর এক পা থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তর করুন কোমরের ব্যথা |
- ভারী জিনিস তোলা: মেঝে থেকে কোনো ভারী জিনিস তোলার সময় কোমর না ঝুঁকিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসুন এবং শরীরের কাছাকাছি এনে তুলুন।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
- ব্রেক নিন: একটানা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের বেশি বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করবেন না। মাঝে মাঝে উঠে হাঁটাহাঁটি ও হালকা স্ট্রেচিং করুন।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজনের কারণে মেরুদণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যা ব্যাক পেইনের অন্যতম কারণ
- সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ঘুমানোর বিছানা: খুব নরম বা স্প্রিংয়ের গদির বদলে সমান এবং মাঝারি শক্ত তোশক বা ম্যাট্রেস ব্যবহার করুন। উপুড় হয়ে শোয়া এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং
- কোর (Core) শক্তিশালী করা: নিয়মিত সাঁতার কাটা, হাঁটা বা হালকা ইয়োগা মেরুদণ্ড ও পিঠের পেশিকে শক্তিশালী করে
- স্ট্রেচিং: হালকা ব্যথার ক্ষেত্রে Knee-to-Chest (হাঁটু বুক পর্যন্ত টানা) স্ট্রেচিং বেশ উপকারী । তবে কোনো ব্যায়ামে ব্যথা বেড়ে গেলে তা বন্ধ করতে হবে।
খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ
- পুষ্টি ও ওমেগা-৩: খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি রাখুন। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন— সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, আখরোট, চিয়া বীজ) প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- মানসিক চাপ কমানো: অতিরিক্ত মানসিক চাপ পিঠের পেশিগুলোকে শক্ত (Tension) করে ব্যথা বাড়াতে পারে। ধ্যান বা যোগব্যায়াম মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে।
- কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- ব্যথার সাথে যদি জ্বর, পা বা পায়ের আঙুল অবশ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারানো, বা পা দুর্বল হওয়ার মতো উপসর্গ থাকে, তবে কোনো ঘরোয়া চিকিৎসা না করে দ্রুত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্টের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রফেসর ডাঃ মোঃ আবু সালেহ আলমগীর
বি পি টি, এম ডি, এম পি এইচ, এম ডি এম আর, পি এইচ ডি
ব্যাক-পেইন ও স্পাইন কেয়ার এন্ড কাইরোপ্রাকটর মেডিসিন ও স্পাইনাল এ্যাডজাস্টমেন্ট, পাবলিক হেলথ ও নিউট্রিশন এবং ডায়েট কাউন্সেলিং ও ওয়েট লস, ডিজএ্যাবিলিটি ও রিহ্যাবিলিটেশন এন্ড ফিজিক্যাল ফিটনেস বিশেষজ্ঞ সিনিয়র ফিজিওথেরাপি মেডিসিন এন্ড ইন্টারভেনশনাল পেইন ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট
কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান
ফিজিওথেরাপি এন্ড রি-হ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, মতিঝিল, ঢাকা
এ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্যঃ ০১৬৪১৫৭৬৭৮৭, ০১৭৩৮৩৯৪৩০৯
