দুর্নীতির বরপুত্র বড়দুয়ারা স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুর কাদের চৌধুরী: অনিয়মের আখড়ায় পরিণত চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ

চট্টগ্রাম থেকে মো: আলমগীর
চট্টগ্রাম থেকে মো: আলমগীর
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬ ১৬:৫৯:২৮

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের অধীন বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনটি এখন প্রকাশ্য লুটপাট ও চাঁদাবাজির দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে, যার মূলে রয়েছেন স্টেশন কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) ফজলুর কাদের চৌধুরী। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের ‘দুর্নীতির বরপুত্র’ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, ফজলুর কাদের চৌধুরীর সরকারি চাকুরির মেয়াদ প্রায় শেষ এবং এই বছরের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে তিনি পিআরএল (SUFAL)-এ যাচ্ছেন। আর এই অবসরের পূর্ববর্তী সময় বা পিআরএল-কে ঘিরে শেষ মুহূর্তে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা লুটে নিতে তিনি যেন একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

বর্তমানে বড়দুয়ারা চেক স্টেশনের সামনে দিয়ে পরিবাহিত হওয়া কাঠ ও ফার্ণিচারের বৈধ টিপি (ট্রান্সপোর্ট পারমিট) এবং শতভাগ সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কাঠ ব্যবসায়ী ও ফার্ণিচার মালিকদের গাড়ি আটকে ফজলুর কাদেরকে গুণতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। বান্দরবান থেকে ছাড়ে আসা বৈধ জোতের কাঠ বোঝাই গাড়ি প্রতি নেওয়া হচ্ছে ৪ হতে ৫ হাজার টাকা এবং ফার্ণিচারের বৈধ গাড়ি থেকে কোনো কারণ ছাড়াই ফার্ণিচারের আইটেম প্রতি ৫০০ হতে ১০০০ টাকা পর্যন্ত প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করা হচ্ছে, যাহা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

এছাড়া পদুয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীর থেকে অর্থাৎ পদুয়া রেঞ্জের হাংগর, ডলু ও টংকাবতী বিট হতে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে অবৈধভাবে কেটে আনা কাঠের পিকআপ ও ট্রাকগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিশেষ ‘লাইনের’ মাধ্যমে নিরাপদে পাচার করার ক্ষেত্রে এই কর্মকর্তা সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আব্দুল ওহাব নামের এক ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিক তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত মাসের শেষের দিকে বান্দরবান থেকে তাঁর নিজের বাসায় ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ বৈধ ও যথাযথ প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে মাত্র ৬ আইটেম ফার্ণিচার নিয়ে আসার পথে বড়দুয়ারা স্টেশনে ফজলুর কাদেরের নির্দেশে গাড়িটি আটকে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রতি আইটেমে ৪ শত টাকা করে মোট দুই হাজার চারশত টাকা চাঁদা বা উৎকোচ দিয়ে তাকে গাড়ির ছাড়পত্র নিতে হয়েছে, যা বন প্রশাসনের চরম নৈতিক স্খলন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, পদুয়া রেঞ্জের বিতর্কিত রেঞ্জ কর্মকর্তা রিয়াদুর রহমান ভূঁইয়ার অতিমাত্রায় প্রশাসনিক প্রশ্রয় ও সরাসরি সহায়তার কারণেই স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুর কাদের চৌধুরী প্রতিনিয়ত এমন বেপরোয়া দুর্নীতি করার সাহস পাচ্ছেন, যার ফলে পদুয়া রেঞ্জের বিস্তীর্ণ সরকারি বনভূমি ও সংরক্ষিত গাছপালা শূন্য হয়ে পুরো অঞ্চলটি মরুভূমিতে পরিণত হতে আর বেশি সময় লাগবে না। এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বড়দুয়ারা স্টেশনে কর্মরত এক বন প্রহরী গোপন তথ্য ফাঁস করে জানান, এই চেক স্টেশন থেকে দৈনিক এবং মাসিক ভিত্তিতে যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা ইনকাম বা চাঁদা আদায় করা হয়, তাহার নির্দিষ্ট ভাগ রেঞ্জার রিয়াদুর রহমান ও ডিএফও সোহেল রানাসহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলের শীর্ষ

টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং এই বিপুল পরিমাণ মাসোহারার কারণেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সবকিছু জেনেও নীরবতা পালন করছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অন্ধের মতো চোখ বন্ধ করে আছেন। বন বিভাগকে চুষে খাওয়া এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ফজলুর কাদের চৌধুরী চাকুরির আড়ালে অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে ইতোমধ্যে বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি, রাজকীয় বাড়ি, বিভিন্ন শহরে বেনামে জমি ক্রয়সহ কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স ও এফডিআর (ঋউজ) অর্জন করেছেন, যার সুনির্দিষ্ট নথিপত্র এবং চাঞ্চল্যকর বিস্তারিত খতিয়ান পরবর্তী পর্বে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ফজলুর কাদের চৌধুরীর দুর্নীতির ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং বন বিভাগের যেখানেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও বনের সম্পদ লুণ্ঠনের মহোৎসব চালিয়েছেন। ইতিপূর্বে ২০২০ সাল হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর তিনি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাটহাজারী রেঞ্জের দায়িত্বে থাকাকালীন সুফল (ঝটঋঅখ) প্রকল্পের বাগান না করেই বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। এছাড়া সরকারের পরিচালন ব্যয় এবং বাঁধ বনায়নের নামে বরাদ্দকৃত বিপুল অংকের অর্থ কোনো কাজ না করেই পকেটস্থ করার মাধ্যমে তিনি শীর্ষ দুর্নীতিলিপ্সু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সুফল প্রকল্পের আওতায় সৃজন করা বাগানসমূহে উপকারভোগী নিয়োগ করার কোনো নিয়ম নীতিমালা না থাকা সত্ত্বেও, ফজলুর কাদের চৌধুরী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসহায় সাধারণ মানুষদের সদস্য করার প্রলোভন দিয়ে সদস্য প্রতি ২০ হতে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে অবৈধভাবে উপকারভোগী নিয়োগ দেন।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ থেকে পরবর্তীতে বন সংরক্ষক (সিএফ) কার্যালয়ের মাধ্যমে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে বদলি হয়ে এই কর্মকর্তার। কক্সবাজার তাঁর নিজ জেলা হওয়ায় সেখানে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে এবং রাজনৈতিক বলয় ব্যবহার করে একাধিক রেঞ্জের দায়িত্ব হাতিয়ে নেন এবং একের পর এক বনভূমি দখলদারদের কাছে বিক্রি, বনের সরকারি গাছ কেটে পাচার, প্রকাশ্য দিবালোকে পাহাড় কাটা এবং ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ করে দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

ফজলুর কাদের চৌধুরীর ক্ষমতার দাপট ও অবৈধ টাকার জোর এতটাই প্রকট যে, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ থেকে বদলি হয়ে আসার সময় তৎকালীন বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিমকে মোটা অংকের উৎকোচ বা ঘুষ প্রদান করে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে পোস্টিং নেন। এরপর চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বর্তমান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানাকে বিপুল পরিমাণ কন্টাক্ট মানি বা মোটা অংকের কালোধন দিয়ে পদুয়া রেঞ্জের অধীন সবচেয়ে লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ ‘বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন’ নিজের নামে ভাগিয়ে নেন।