নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই বছরের পর বছর নীলক্ষেত মহিলা হোষ্টেলে ১৯ নারী
নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই রাজধানীর নীলক্ষেতের কর্মজীবী মহিলা হোষ্টেলে বছরের পর বছর (১৪ থেকে ২০ বছর) ধরে বসবাস করছেন ১৯ নারী। কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করেও তাদের হোস্টেল ছাড়াতে পারছেন না।
নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই রাজধানীর নীলক্ষেতের কর্মজীবী মহিলা হোষ্টেলে বছরের পর বছর (১৪ থেকে ২০ বছর) ধরে বসবাস করছেন ১৯ নারী। কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করেও তাদের হোস্টেল ছাড়াতে পারছেন না। পাশপাশি প্রশ্ন উঠেছে এত দীর্ঘ সময় ধরে কিভাবে তারা একই হোস্টেলে বসবাস করলেন। মানবিক দিক বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ যেন তাদের আরো কিছু সময় হোস্টেলে থাকার সুযোগ দেন বলে এখনো দাবি করে যাচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বলছেন, তারা নিয়ম মেনে চলে গেলে হোস্টেলে নতুন কর্মজীবী নারীরা বসবাসের সুযোগ পাবেন যাতে তাদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে। রবিবার দুপুরে সরেজমিনে নীলক্ষেতের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কমজীবী মহিলা হোষ্টেলে গিয়ে দেখা যায় হোস্টেল সুপার ছামিনা হাফিজের কক্ষে উপস্থিত হয়েছেন কয়েকজন কর্মজীবী নারী। তারা বারবারই হোস্টেল সুপারকে অনুরোধ করছেন তাদেরকে যেন আরো কিছু সময় হোস্টেলে বসবাস করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। এজন্য হোস্টেল সুপার যেন যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। ওই নারীদের কন্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ছাপ।
কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি হোস্টেলে দীর্ঘসময় (১৪ বছর থেকে ২০ বছর) ধরে বসবাস করা ২৫ জন কর্মজীবী নারীকে হোস্টেল ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জন এরই মধ্যে হোস্টেল ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আর ১৯ জন এখনো যাননি। এদের মধ্যে এই হোস্টেলে যিনি সবচেয়ে কম সময় থেকেছেন তার মেয়াদ ১৪ বছর ৫ মাস। আর যিনি সবচেয়ে বেশি সময় থেকেছেন তার মেয়াদ ২০ বছর ১০ মাস।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নীলক্ষেতের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোষ্টেলে অধিকাংশ সময় দলীয় বিবেচনায় নারীদের সিট দেয়া হয়। যখন যেই রাজনৈতিক দল সরকারে থাকেন তাদের পক্ষ থেকে লবিং করে এই হোস্টেলে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়। দলীয় প্রভাবে যারা সিট পান তারা কোনো নিয়ম কানুন মানেন না। পাশপাশি তাদের ভয়ে অনেকেই কোনো কথাও বলেন না। হোস্টেলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আজকের সংবাদকে জানান, সম্প্রতি এই হোস্টেলে ১৫ বছর ৪ মাস ধরে বসবাস করা খন্দকার সুলতানা ইয়াসমিন মৌসুমীকে কর্তৃপক্ষ হোস্টেল ছাড়তে বলেন। প্রায় দুই দশক আগে তিনি যখন হোস্টেলে সিট বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিলেন তখন সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের এক সাবেক হেভিওয়েটের সুপারিশ ছিল। আর এখন যখন তাকে সিট ছাড়তে বলা হচ্ছে তখন এক বিএনপি নেতা তাকে নিজ দলের কর্মী পরিচয় দিয়ে কর্তৃপক্ষকে ফোন করে সুপারিশ করেছেন যেন তাকে কোনোভাবেই হোস্টেল ছাড়তে না হয়।
সর্ব্বোচ্চ সময় ধরে হোস্টেলে থাকা কর্মজীবী নারী সামিনা আক্তার বলেন, আমরা হোস্টেলের নীতিমালা মানিনি এটা হয়তো ঠিক। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই তো এতদিন থেকেছি। কর্তৃপক্ষ চাইলে এখনো মানবিক কারনে আমাদের আরো কিছু সময় হোস্টেলে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে। তাছাড়া আমরা তো সব ধরনের আইন মেনেই এখানে বসবাস করছি। সামিনার অভিযোগ, হোস্টেলের এমন অনেকেই থাকেন যারা কর্মজীবী নন। ভূয়া নিয়োগ পত্র দেখিয়ে তারা দিনের পর দিন হোস্টেলে থাকছেন। অথচ যারা একেবারেই কর্মজীবী তাদের কর্তৃপক্ষ কোনো যৌক্তিক কারন ছাড়াই চলে যেতে বলছেন।
এছাড়াও অনেক নারী এতটাই অসহায় যে তারা ছুটি পেলে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ারও সুযোগ পান না। এমন মানুষগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ মানবিক হলে তো কোনো সমস্যা থাকার কথাও নয়। ১৫ বছর ৫ মাস ধরে হোস্টেলে বসবাস করা ফৌজিয়া সুলতানা নামের এক নারী বলেন, কয়েক মাস আগে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ তাদের কয়েকজনকে হোস্টেল ছাড়তে বলেন। তারা ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে কিছু সময় চান যেন তারা একটা সময় নিয়ে ভালো মতো হোস্টেল ছাড়তে পারেন।
তবে কর্তৃপক্ষ কোনো মানবিক দিক বিবেচনা না করেই তাদের হোস্টেল ছাড়ার সময় সীমা বেঁধে দিয়েছেন এবং তাদের চলে যেতে নানা ভাবে চাপ তৈরি করছেন। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোষ্টেল কর্তৃপক্ষ আজকের সংবাদকে জানান, হোস্টেলে কর্মজীবী নারী রুলিয়া আক্তার ২০ বছর ৭মাস, নিখাত সুলতানা ১৯ বছর ৯ মাস, শারমিন ফাতেমা ১৯ বছর ১০ মাস, শামসুন নাহিদ সিদ্দিকী ১৯ বছর ৩ মাস, ফারজানা ১৭ বছর ১১ মাস, জান্নাত-ই-নূর ১২ বছর ৮ মাস, মরিয়ম সুলতানা ১৬ বছর ৭ মাস, নাদিয়া সুলতানা ১৪ বছর ১০ মাস, রাহিমা আক্তার ১৭ বছর ৬ মাস, ডালিয়া নাসরিন ১৭ বছর ৯ মাস,নূর-ই-ফেরদৌস ১৭ বছর ১০ মাস, আসমা আহমেদ ১৪ বছর ৫ মাস, শিল্পী রানী সাহা ১৬ বছর ৮ মাস, আয়েশা হক ১৬ বছর ৭ মাস, স্নেহা বাড়ৈ ১৫ বছর ৬ মাস এবং অনিমা বসাক ১৫ বছর ২ মাস ধরে বসবাস করছেন। যাদের এরই মধ্যে হোস্টেল ছাড়তে বলা হয়েছে। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কমজীবী মহিলা হোষ্টেলের হোস্টেল সুপার ছামিনা হাফিজ বলেন, হোষ্টেলে কোনো কর্মজীবী নারী অন্তত ৪ বছর থাকতে পারেন বলে নিয়ম আছে।
তবে মানবিক কারনে বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অনেকের সময় বাড়িয়ে থাকে। তখন কেউ কেউ বাড়তি সময় থাকার সুযোগ পান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখন যাদের হোস্টেল ছাড়তে বলছে তাদের সব ধরনের নিয়ম নীতি মেনেই চলে যেতে বলা হচ্ছে।