হারিয়ে যাচ্ছে এদেশের নদী-নালা, খাল-বিল: প্রকৃতির কান্না শুনছে কে?
বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন কোনো শিল্পী সবুজ ক্যানভাসের ওপর নীল রঙের অসংখ্য আঁকিবুঁকি এঁকে দিয়েছেন। সেই আঁকিবুঁকিই আমাদের নদী, খাল, বিল ও জলাভূমি। শত শত বছর ধরে এই জলধারা শুধু প্রকৃতিকে নয়, এ দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
একসময় গ্রামের সকাল শুরু হতো নদীর ঢেউয়ের শব্দে। খালের ঘাটে কলসি কাঁখে নারীদের আনাগোনা, বিলের জলে জেলেদের জাল ফেলা, আর নদীপথে নৌকার চলাচল ছিল বাংলার চিরচেনা দৃশ্য। বর্ষাকালে নদী ফিরত তার র্পূন যৌবন নিয়ে। মাঠে মাঠে ছড়িয়ে পড়ত উর্বর পলি। নদী ছিল কৃষকের বন্ধু, জেলের আশ্রয়, নাবিকের পথপ্রদর্শক এবং কবির অনুপ্রেরণা।
কিন্তু আজ সেই নদী-নালা, খাল-বিল যেন নীরবে কাঁদছে।
যে নদীর বুকে একসময় পালতোলা নৌকা ভেসে বেড়াত, সেখানে আজ দেখা যায় বালুর স্তূপ, দখলদারদের স্থাপনা আর কালো দূষিত পানি। যে খালে শিশুরা সাঁতার কাটত, মাছ ধরত, সেই খাল আজ আবর্জনার ভাগাড়। যে বিল একসময় হাজারো মাছ, পাখি আর জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাস ছিল, তা আজ ভরাট হয়ে পরিণত হয়েছে ইট-পাথরের নির্মাণস্থলে।মানুষের সীমাহীন লোভ আর অবহেলায় ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ। নদীর তীর দখল হচ্ছে, খাল ভরাট হচ্ছে, শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি, নদী শুধু একটি জলধারা নয়; নদী একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ।
একজন বৃদ্ধ কৃষক যখন বলেন, "এই নদীতে একসময় নৌকা বাইতাম," তখন তার কণ্ঠে শুধু স্মৃতি নয়, হারিয়ে যাওয়ার কষ্টও লুকিয়ে থাকে। একজন জেলে যখন খালি হাতে ঘরে ফেরেন, তখন শুধু তার সংসার নয়, নদীকেন্দ্রিক একটি জীবনব্যবস্থাও সংকটে পড়ে। গ্রামের শিশুরা আজ নদীর গল্প শুনে, কিন্তু সেই নদীকে চোখে দেখে না। তারা জানে না কেমন ছিল ভোরের কুয়াশায় নদীর বুক, কিংবা বর্ষার জলে টইটম্বুর খালের সৌন্দর্য।
প্রকৃতি কখনো কথা বলে না, কিন্তু তার নীরবতাও অনেক কিছু বলে দেয়। নদী শুকিয়ে গেলে খরা বাড়ে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, মাছ কমে যায়, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষই।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা নদীকে ব্যবহার করেছি, কিন্তু ভালোবাসিনি। খাল থেকে পানি নিয়েছি, কিন্তু খালকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করিনি। নদীর বুক চিরে সম্পদ নিয়েছি, কিন্তু নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগ দেখাইনি।
আজ যদি আমরা আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পড়বে—বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক দেশ। তারা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারবে না যে একসময় এই দেশের প্রতিটি জনপদ নদীর সুরে মুখরিত ছিল।
তাই এখনই সময় জেগে ওঠার। নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। খাল-বিল পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ নদীকে বাঁচানো মানে শুধু পানি বাঁচানো নয়; বাঁচানো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎকে।
নদী শুকিয়ে গেলে শুধু একটি জলধারা হারায় না, হারিয়ে যায় একটি জনপদের প্রাণ, একটি জাতির স্মৃতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প।
আজও দেশের কোনো নির্জন নদীর তীরে দাঁড়ালে মনে হয়, নদী যেন মানুষের কাছে একটাই প্রশ্ন করছে—"আমি তো যুগের পর যুগ তোমাদের জীবন দিয়েছি, তোমরা কি আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে না?"