মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদককে খুলনার রূপসা কলেজে পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে নাম প্রস্তাব কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
রূপসা কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে ফ্যাসিস্ট সরকারের চিহ্নিত এক দোসরের নাম প্রস্তাব করায় কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রূপসা কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে ফ্যাসিস্ট সরকারের চিহ্নিত এক দোসরের নাম প্রস্তাব করায় কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওই কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়ে ইতোমধ্যে তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছে। ওই লিখিত অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা, সচিব, শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি, খুলনা জেলা প্রশাসক ও রূপসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১৯ মার্চ রূপসা কলেজের এডহক কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক যে কমিটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে উক্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোননীত করা হয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারে দোষর মৈয়ত্রী সরকার ওরফে রমা সরকারকে। একই পদে আরো দুইজনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে যারা এলাকার বাসিন্দা নয়। এমনকি তারাও ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক ছিলেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আমরা উক্ত বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত প্রস্তাবিত কমিটি বাতিলপূর্বক নতুন একটি স্বচ্ছ কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি।
খুলনা জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের কার্যকারী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন মৈয়ত্রী সরকার। ২০১২ সালে কলেজের অধ্যক্ষ অবসরে গেলে ভাইস প্রিন্সিপাল ও সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে সকল আইন লঙ্ঘন করে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে এবং রূপসা কলেজের সভাপতি খুলনা জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মোল্লা জালালকে ম্যানেজ করে প্রিন্সিপালের চেয়ার বাগিয়ে নেন তিনি। তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে অর্থ তসরুপসহ নানা ধরনের অনিয়ম করেন। তার প্রভাবের কারণে কোন হিসাব নিকাশ পর্যন্ত করার কেউ সাহস পাইনি। তিনি একজন নাস্তিক। ধর্মান্তরিত না হয়েও একজন মুসলমানের সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ সংসার করছেন।
ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পলায়নের পর অর্ন্তবর্তী সরকার দেশের সব স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। পরে এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। সেখানেও এই রমা সরকার অত্যন্ত সুচতুরভাবে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তিনি অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মী নির্যাতিত ও বিতাড়িত হয়েছে। রূপসা কলেজে তার সভাপতি হওয়ার মুল উদ্দেশ্যে ছাত্রলীগকে পুনর্গঠিত করা। এমনকি তার চারিত্রিক সমস্যা ও প্রকট ছিল। ইংরেজি সহকারী অধ্যাপক মানিক সি দাসের সাথে তার যে অনৈতিক সম্পর্ক ছিল তা কলেজের সবাই জানে।
লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়, অনতিবিলম্বে কলেজের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি পদ থেকে তাকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠণসহ তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে এলাকাবাসী, ছাত্র-ছাত্রী কলেজ ঘেরাও, রাজপথ দখল ও মানববন্ধনের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য থাকবে। প্রসঙ্গত, গেল বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর রূপসা কলেজের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করা হয়। গঠন করা হয় ৫ সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে ছিলেন সভাপতি মোঃ খাইরুল ইসলাম, সদস্য সচিব ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ শহিদুল্লাহ, দাতা সদস্য মোঃ মহিউদ্দিন শেখ, বিদ্যোৎসাহী সদস্য মৈয়ত্রী সরকার ও শিক্ষক প্রতিনিধি উদ্ধব চন্দ্র পাল। এই ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মধ্যে অদৃশ্য শক্তি বলে খুলনা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মৈয়ত্রী সরকার অন্তর্ভুক্ত হয়। এনিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করতে থাকে।
এদিকে গত ১৯ মার্চ এডহক কমিটির সভায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সভাপতি পদে মৈয়ত্রী সরকার, সুস্মিতা দাস গুপ্তা ও দেব প্রসাদ টিকাদারের নামের প্রস্তাবনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। এই তিনজনের একজনের বাড়িও রূপসা এলাকায় নয়। তবে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এডহক কমিটির ওই সভায় উপস্থিতির জন্য দাতা সদস্য মোঃ মহিউদ্দিন শেখকে কখনো কোন নোটিশ প্রদান বা দাওয়াত দেওয়া হয়নি। তার অনুপস্থিতিতে পাঁচজনের তিনজনকে নিয়ে গোপনীয়ভাবে মিটিং করে এই কমিটি পাঠানো হয়।
বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে গত ২৮ এপ্রিল দাতা সদস্য মোঃ মহিউদ্দিন শেখ, নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মোল্লা সাইফুর রহমানসহ স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং অভিভাবক মহল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে যান। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন কিছু জানেন না বলে জানিয়ে দেন। এমনকি ম্যানেজিং কমিটি গঠন করতে হলে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিধান থাকলেও তার কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ বিজ্ঞাপন ও সংবাদপত্র ব্যয় হিসেবে ৫৭১০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। এব্যাপারে মোঃ মহিউদ্দিন শেখ বলেন, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের তিন বিঘা জমি দেওয়া রয়েছে। এখনো ৭কাটা জমি রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। অথচ এখানে যে মিটিং হয়েছে এর একটি মিটিং এর ব্যাপারেও আমাকে জানানো হয়নি।
তিনি বলেন এখানে কোন ফ্যাসিসের জায়গা হবেনা। যে কমিটি পাঠানো হয়েছে তা বাতিল পূর্বক নতুন কমিটি গঠন করতে হবে। রূপসা উপজেলা বিএনপি'র আহবায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোল্লা সাইফুর রহমান বলেন, সভাপতি হিসেবে যে তিনজনের নাম পাঠানো হয়েছে তারা কেউ এই এলাকার বাসিন্দা নয়। এমনকি তাদের অনেকে রয়েছে ফ্যাসিবাদ সরকারের দোসর। এই এলাকার মানুষের অর্থ ও শ্রম দিয়ে গড়া এই প্রতিষ্ঠান। এখানে দায়িত্বশীল জায়গায় এখানকার মানুষদের আসতে হবে। বহিরাগত বা ফ্যাসিবাদদের কোনো ঠাঁই হবে না।
তিনি এই কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ শহিদুল্লাহ বলেন, কমিটিতে যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের অনেককেই আমি চিনিনা। এডহক কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক নামগুলো পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলে পুনরায় মিটিং করে নতুন কমিটি দেওয়া যেতে পারে।