ডিএফও’র অব্যাহত অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় বরিশাল সামাজিক বন বিভাগ অশান্ত

বরিশাল সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. মোঃ আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ডিএফও’র অব্যাহত অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় বরিশাল সামাজিক বন বিভাগ অশান্ত

বরিশাল সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. মোঃ আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, এই কর্মকর্তা যোগদানের পর থেকে বেপরোয়া ঘুষ গ্রহণ, আর্থিক অনিয়ম সহ অধঃস্থনদের ওপর আক্রোশমূলক নির্যাতন রাখায় গোটা বন বিভাগ অশান্ত হয়ে উঠেছে।

এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সমূহের মধ্যে রয়েছে পিআরএল এ যাওয়া কর্মচারীদের এককালীন বেতন ও পেনশন পাওয়ার বিষয়ে ঘুষ না পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অযুহাতে তাহাদের ফাইল ২/৩ মাস ঘুরানোর মাধ্যমে হয়রানি করে থাকেন। বন প্রহরী নাসির খান, আলহাজ্ব মোস্তফা, নৌকা চালক মো: সেলিম সহ বেশ কয়েকজন বন কর্মচারীর কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ফাইলে সই করেছেন।

পিআরএল এ যাওয়া ফরেস্টার সেলিম আহমেদ ঘুষ না দেয়ায় তার পেনসন না পেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ্যাবস্থায় বেশ কয়েকবার বেতন ও পেনশন পাবার জন্য ডিএফও এর সাথে সাক্ষাত করেও বিফল হন। পেনশন না পাওয়ার কারণে এক পর্যায়ে উক্ত ফরেস্টার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু অদ্যাবধি তার পেনশনের কোন সুরাহা করেননি। গত ১৬ জানুয়ারী দপ্তরে কম্পিউটার ক্রয়ের জন্য এম.এম কর্পোরেশন নামক প্রতিষ্ঠানের নামে এক লক্ষ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করেন এবং কম্পিউটার সরবরাহ না নিয়ে ঠিকাদারের সাথে আতাত করে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কর্তৃক সামগ্রী গ্রহন ও বিল প্রদানের সুপারিশ ছাড়াই ১৮ জানুয়ারী বিলের চেক প্রদান করেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি ২৯ জানুয়ারী নিম্নমানের একটি কম্পিউটার কেনেন। সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ডিএফও এর ঘুষ গ্রহন ও দুর্নীতির বিষয়ে ব্যাপক সহযোগিতা না করার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে পটুয়াখালী বন বিভাগে বদলী করান এবং ডিভিশনে অনেক সিনিয়র ফরেস্টার চাকুরিরত থাকার পরেও, ডিএফও এর কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনের জন্য, চাকুরির বয়স মাত্র ৩ বৎসরের ফরেস্টার আবু সুফিয়ানকে বিধি বহিঃভূতভাবে সদর রেঞ্জের, রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেন এবং ২৩ জানুয়ারী তড়িঘড়ি করে মামুন সাহেবের দায়িত্ব হস্তান্তর করার পরের দিন, চারা উত্তোলন কাজের জন্য (বন অগ্রিম) হিসাবে =১,৮০,০০০/- টাকার চেক প্রদান করেন এবং ২৫ জানুয়ারী =২,৪৩,০০০/- টাকার বন অগ্রিমের চেক প্রদান করেন এবং বর্তমান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (জুনিয়র ফরেস্টার), অন্যান্য রেঞ্জ কর্মকর্তাদের নিকট থেকে ডিএফও এর জন্য ২০% ঘুষ কেটে রাখেন (পূর্বে নিতেন ১৫%)। এমতাবস্থায় সকল রেঞ্জাররা ডিএফও কর্তৃক ২০% ঘুষ কেটে রাখার কারণে বাকি টাকা তারা গ্রহন করেন নি। কেননা অবশিষ্ট টাকা দিয়ে চারা উত্তোলণ করা সম্ভব নয়।

আবার স'মিল মালিকদের নিকট থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ গ্রহন করতে না পেরে স'মিলের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে বিভিন্নভাবে তালবাহানা করে হয়রানি করে আসছেন। সদর দপ্তরে কর্মরত বাগান মালী মরিয়মকে কুপ্রস্তাব দিলে মরিয়ম রাজী না হওয়াতে তাকে একটি প্রত্যন্ত উপজেলা মুলাদীতে বদলী করেন। কর্মরত অসহায় মহিলারা ছুটি চাহিলে ছুটি দেন না। কিন্তু ডিএফও কর্তৃক নিয়োজিত দালালের মাধ্যমে ১/২ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহন করে ছুটি মঞ্জুর করেন। আরও উল্লেখ্য যে, বিধান সরকার নামে বাগান মালীকে ১৩ জুন, ২২ তারিখে বাকেরগঞ্জ এসএফপিসিতে দায়িত্ব পালনের জন্য বদলী করেন। উক্ত বাগান মালির নিকট থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহন করেন। পরবর্তীতে উক্ত বাগান মালিকে তার বাড়ী বানারীপাড়াতে ডিউটি করার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন এবং অদ্যাবধি উক্ত বাগান মালি তার বাড়ীতে ঘোরাফেরা করে সরকারি বেতন নিতেছেন এবং ডিএফও তাকে বেতন দিতেছেন।

ডিভিশনে অনেক সিনিয়র ফরেষ্টার থাকার পরেও ডিএফও এর অনুসারী মোঃ আবু তাহের নামে একজন বন প্রহরীকে বানারীপাড়া উপজেলা বন কর্মকর্তার পদে দায়িত্ব দেন? অন্যদিকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল অনুসারে কর্মচারীদের পোষাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিএফওর আর্থিক ক্ষমতা তিন লক্ষ টাকা সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও বিধি বর্হিভূতভাবে বিগত ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে চার লক্ষ আটচল্লিশ হাজার দুইশত বিশ টাকার ম্যানুয়াল কোটেশন করেন। উল্লেখ্য যে, চলমান ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বরাদ্দপ্রাপ্ত পোষাক সরবরাহ খাতে ৪,৫০,০০০/- গাড়ীর পার্ট সরবরাহ কাজে =২,০০,০০০/-, ফার্নিচার সরবরাহ কাজে ২,০০,০০০/- এবং অন্যান্য মেরামত কাজ গুলি, এমএম কর্পোরেশন নামক প্রতিষ্ঠানের সাথে আতাতের মাধ্যমে ম্যানুয়্যাল কোটেশন করার পায়তারা করছেন।

বিগত ২০২২-২০২৩ইং অর্থবছরে কাশিপুরে অবস্থিত রেস্ট হাউজ মেরামত কাজ ঠিকাদার কর্তৃক মেরামত কাজটি সম্পূর্ণ সমাপ্ত করার পরবর্তীতে তদারকির দায়িত্ব প্রাপ্ত সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা, আব্দুল্লাহ আল মামুন, কার্য সমাপ্তি রিপোর্ট ও বিল প্রদানের জন্য সুপারিশ প্রদান করেন এবং ঠিকাদারের নিকট থেকে ১৫% ঘুষ আদায় করতে না পেরে, ঠিকাদারের দাখিলকৃত ও সুপারিশকৃত বিলের চেক প্রদান না করে বিধি বর্হিভূতভাবে পুণরায় তদারক কমিটি গঠন করেন। বিল পাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ৩ বার আবেদন নিবেদন করার পরে এবং বিলের চেক কেটে রাখার দীর্ঘ ১ মাস ১৬ দিন পরে, বন সংরক্ষক সাহেবের নির্দেশে ঠিকাদারকে চেক প্রদান করেন।

ড. আব্দুল আউয়াল বিগত ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের ০৬/০৩/২০২৩ইং ৪টি কাজের কার্যাদেশ প্রদান করেন। পরবর্তীতে অডিট আপত্তি ও রুলের কথা বলে কাজের শেষ পর্যায়ে এমন অবস্থায় ২৩/০৩/২০২৩ইং তারিখে উক্ত কার্যাদেশ বাতিল করেন। উল্লেখ্য যে, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হয়ে আর্থিক ক্ষমতা হিসাব নিকাশ না  করে কোটেশন আহ্বান করে কার্যাদেশ প্রদানের পরে মেরামত কাজ শেষ পর্যায়ে এমন সময় কার্যাদেশ বাতিল করেন। এস.এম. কাওসার হোসেন ফরেস্টার চিকিৎসার জন্য ভারতে গমনের উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট করার জন্য NOC চেয়ে ডিএফও এর বরাবরে আবেদন করিলে উক্ত ফরেস্টারের নিকট থেকে উৎকোচ গ্রহনে ব্যর্থ হয়ে, দীর্ঘ ২ মাসের বেশী হয়রানী করতে থাকেন। পরবর্তীতে এস.এম. কাওছার বন সংরক্ষকের নিকট আবেদন করলে ঐ দিনই তাৎক্ষনিক ডি.এফ.ও সাহেব এস.এম. কাওছার, ফরেস্টার কে NOCপ্রদান করেন।

গত ২৫ জানুয়ারী তিনি সরকারী কাজে ঢাকা গমনের জন্য মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশন বরিশাল  থেকে ৮০ লিটার তৈল উত্তোলণ করে সরকারী গাড়ীতে না ঢুকিয়ে, তার ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ীতে সরকারী তৈল ভরে ঢাকা যান বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বাসভবনের ভিতরে একটি সরকারি অফিস কক্ষ রয়েছে। তাতে মাত্র ১টি বাল্ব ও ১টি ফ্যান চলে। কিন্তু বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বাসভবনে গ্রিজার, রুম হিটার, রান্নার জন্য হিটার, রাইস কুকার, ফ্রিজ, আইপিএস, এসি, ৮/১০টি বাল্ব এবং ৪/৫টি ফ্যান প্রতিনিয়িত ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু ডিএফও সাহেব তার বাসার মিটারের লাইনটি অফিসের কক্ষে সংযোগ দিয়েছেন। যে কারণে এতকিছু ব্যবহারের পরেও ডিএফও এর বাড়ীতে ডিসেম্বর/২০২৩ মাসে বিদ্যুৎ বিল আসছে ৯৪৫/- টাকা এবং তার বাসায় সংযুক্ত একটি অফিস কক্ষে ডিসেম্বর/২০২৩ মাসে বিদ্যুৎ হইয়াছে ১০,৮৩৩/- টাকা। ডিভিশনে কোন উপজেলায় কর্মকর্তার অফিস/বাসভবন নেই। নার্সারী কেন্দ্র গুলোতে চারা উত্তোলনের জন্য কোন স্থায়ী নার্সারী বেড নেই, গৌরনদী SFNTC অরক্ষিত এবং গরু ছাগল থাকে। কাশিপুর বন সংরক্ষকের অফিসের সম্মুখ ভাগের সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হলেও সংস্কারের কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বন সংরক্ষকের দপ্তরের পূর্ব দিকে কোন সীমানা দেয়াল নেই। যে কারণে গরু, ছাগল বিচরণ করে এবং রাতে মাদকের আড্ডা বসে। ডিএফও’র এহেন স্বেচ্ছাচারিতা ও ঘুষ লিপ্সার কারনে অধ:স্থন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তারা এতদ্বসংক্রান্তে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব ও দুদকসহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে ডিএফও’র বিরুদ্ধে সরেজমিন তদন্ত দাবী করেছেন।

উল্লেখ্য ড. আব্দুল আউয়াল বগুড়া ডিভিশনে চাকুরী করা কালীন সময়ে প্রায় ৪০,০০,০০০ (চল্লিশ লক্ষ) টাকার আর্থিক অনিয়ম করিয়া আসেন। এতদ্বসংক্রান্তে প্রধান বন সংরক্ষক অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য, উপ প্রধান বন সংরক্ষক ড. জগলুল হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। এছাড়া বগুড়া ডিভিশনের ১৮ জন কর্মচারীর নিকট থেকে এসিআর প্রেরণের লক্ষ্যে জন প্রতি ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করে এবং উৎকোচ না পাইয়া বিক্ষুদ্ধ হইয়া ১৮ জন কর্মচারীর এসিআরএ বিরুপ মন্তব্য করে তিনি উর্ধ্বতন মহলে প্রেরণ করেন।

এছাড়াও তিনি বগুড়া ডিভিশনে চাকুরি করার সময় তৎকালীন হিসাবরক্ষক মোঃ মনসুর, ডিএফও কর্তৃক বিভিন্নভাবে অন্যায়, অত্যাচার ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অফিসের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ ব্যাপারে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।